নগরের বাইরে
১৮ দিন পাম্প বিকল: সুপেয় পানির অপেক্ষায় ফতুল্লার ৫০ হাজার মানুষ
ভোরের আলো ফুটতেই হাতে বালতি, কলসি আর পানির জার নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ফতুল্লার কায়েমপুর এলাকার হাজারো মানুষ। কারও গন্তব্য সিটি করপোরেশনের পানির গাড়ির লাইন, কারও আবার পাশের মহল্লার টিউবওয়েল। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের একটাই সংগ্রাম—সুপেয় পানি।
গত ১৮ দিন ধরে কায়েমপুর এলাকার গভীর নলকূপ বিকল হয়ে থাকায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবন যেন থমকে গেছে। আধুনিক নগর জীবনের এই সময়ে এসে পানির জন্য এমন হাহাকার অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই এলাকার মানুষ এখন প্রতিদিন পানির জন্য যুদ্ধ করছেন।
সকালের ব্যস্ততা এখানে আর কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় পানি সংগ্রহের লড়াই দিয়ে। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, গৃহিণী সবার সময়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে শুধু পানি জোগাড় করতে।
স্থানীয় বাসিন্দা রোকেয়া বেগমের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। তিনি বলেন, “ঘরে ছোট ছোট বাচ্চা। রান্না করব, কাপড় ধোব, ওদের গোসল করাব—সবকিছুর জন্য পানি দরকার। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পানি নেই। প্রতিদিন সিটি করপোরেশনের গাড়ি আসে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। সমুদ্রে কয়েক ফোঁটা পানির মতো। তার ওপর দীর্ঘ লাইন। অনেক সময় পানিই পাই না। এভাবে আর কতদিন?”
স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত ২৬ মে প্রথম গভীর নলকূপটি বিকল হয়ে যায়। পরে সেটি মেরামত করা হলেও দুই দিনের মাথায় আবার নষ্ট হয়ে পড়ে। এরপর থেকে গত ১৮ দিন ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। নলকূপ বন্ধ থাকায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ গাড়ি পানি সরবরাহ করছে। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় খুবই অপর্যাপ্ত।
তাদের অভিযোগ, বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে পাশ্ববর্তী পুকুর ডোবার পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে। এমনটা চলতে থাকলে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়বে। এছাড়া অপর্যাপ্ত পানি ব্যবহারের কারণে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এ বিষয়ে বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও এখনো কার্যকর সমাধান মেলেনি। প্রতিদিনই তারা আশ্বাস শুনছেন, কিন্তু কলের মুখে ফিরছে না পানি।
নাসিকের পানি সরবরাহ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কায়েমপুর এলাকায় দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৬০ লাখ লিটার। অথচ আশপাশে কোনো বিকল্প গভীর নলকূপ না থাকায় বাধ্য হয়ে পানির গাড়ির মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের পানিবাহী গাড়ি মাত্র তিনটি। ফলে প্রতিবার প্রায় তিন হাজার লিটার করে দিনে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
বয়স্ক বাসিন্দা আবদুল হালিম বলেন, “কায়েমপুর সিটি করপোরেশনে না হওয়ায় আমাদের প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে। আমাদের সমস্যার দিকে কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে না। আমরা যদি শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার বাসিন্দা হতাম, তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। আমাদের এমপি সাহেব আমাদের দুর্ভোগ দেখেগেছেন কিন্তু কিছুই করেনি। জনপ্রতিনিধিরাও আমাদের কষ্ট না বুঝলে আমরা কার কাছে যাব।”
নাসিকের পানি সরবরাহ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল জোবায়ের বলেন, “গভীর নলকূপটির ফিল্টার জ্যাম হয়ে গেছে। এটি পরিষ্কার করার জন্য ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ টিম এনে কাজ করানো হচ্ছে। তবে প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ ফিল্টার জেট ওয়াশ করার কাজ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। সাধারণত এ ধরনের কাজে অন্তত এক মাস সময় লাগে। তারপরও আমরা দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। এ সময়ের মধ্যে পানির চাহিদা পূরণে গাড়ির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পঞ্চায়েতের সহযোগিতায় স্থানীয়দের ব্যক্তিগত নলকূপ থেকেও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশা করছি, আগামী সপ্তাহের মধ্যে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।”
প্রতিবার নলকূপ বিকল হলে যে জটিলতা ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, তা এড়াতে একটি বিকল্প গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আবদুল্লাহ আল জোবায়ের বলেন, “ইতোমধ্যে নতুন নলকূপ স্থাপনের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। ওয়ার্ক অর্ডারও দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে স্থাপনকাজ শুরু করা হবে।”