politics
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির কোন্দল চরমে: দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে একজোট ৭ বঞ্চিত নেতা, অতীতের বৈরিতা গৌণ
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির কোন্দল চরমে: দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে একজোট ৭ বঞ্চিত নেতা, অতীতের বৈরিতা গৌণ
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দল কর্তৃক প্রাথমিকভাবে ঘোষিত প্রার্থী, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে মাঠে নেমেছেন সাতজন প্রভাবশালী মনোনয়ন-বঞ্চিত নেতা। এই জোটবদ্ধতার মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্যসহ একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী, যারা একসময় একে অপরের বিরুদ্ধে তিক্ত বাক্য বিনিময় ও এমনকি হত্যাচেষ্টার অভিযোগেও জড়িয়েছিলেন।
গত ৩ নভেম্বর সারাদেশে ২৩৭ আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে আজহারুল ইসলাম মান্নানের নাম ঘোষণা করা হয়, যিনি গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
ঐতিহাসিক বিভেদ ভুলে জোটবদ্ধতা
সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ও সোনারগাঁ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম, সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ওয়ালিউর রহমান আপেল, সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আবু জাফর, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি অধ্যাপক ওয়াহিদ বিন ইমতিয়াজ বকুল এবং সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আল মুজাহিদ মল্লিক।
বিগত সময়ে এই নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ব্যক্তিগত বৈরিতা ছিল। বিশেষ করে, ২০২২ সালের ২৫ এপ্রিল রাতে জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় গিয়াসউদ্দিনের ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, যা তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমানে, দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে তাদের সবার একজোট হওয়া স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাদের অতীতের সব বিভেদ ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব যেন এখন গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতার সামনে।
বঞ্চিতদের অভিযোগ ও দাবি
মনোনয়ন-বঞ্চিত এই সাত নেতা দলীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। অভিযোগে তারা আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব: মান্নানের কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যেখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী (ড. মো. ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া) অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন।
অসদাচরণ ও দল-ক্ষতি: দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণের সাথে অশালীন আচরণ এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
চাঁদাবাজি ও অবৈধ কর্মকাণ্ড: ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে এলাকায় চাঁদাবাজি, দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বালু ব্যবসা এবং আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাদের সাথে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
নেতিবাচক প্রচারণার অভিযোগ: তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করেছেন, মনোনয়ন-বঞ্চিতরা আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিরুদ্ধে এলাকায় নেতিবাচক প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছেন, যা দলের সামগ্রিক ঐক্য ও নির্বাচনী সম্ভাবনার ক্ষতি করছে।
মান্নানের প্রচেষ্টা ও জোটবদ্ধতার কারণ
দলের অভ্যন্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মনোনয়ন পাওয়ার পর আজহারুল ইসলাম মান্নান বঞ্চিত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন ও অধ্যাপক মামুন মাহমুদের সঙ্গে দেখাও করেন। কিন্তু তার সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি, বরং তারা মান্নানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এমনকি গত মঙ্গলবার সিদ্ধিরগঞ্জে মান্নানের বিরুদ্ধে অনুসারীদের দিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়।
বঞ্চিত নেতাদের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। স্থানীয় নেতাকর্মী ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই কোন্দল দলের ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করে নির্বাচনী মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দলীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থের প্রাধান্য এই বিরোধের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।