মদনপুর ভূমি অফিস যেন ঘুষের ‘স্বর্গরাজ্য’: নায়েব হাবিবুরের বিরুদ্ধে কোটি টাকার সম্পদ ও সাংবাদিক পেটানোর অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস যেন ঘুষ ও দুর্নীতির এক ‘স্বর্গরাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। অত্র অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) মো. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, প্রকাশ্য ঘুষ লেনদেন, অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া এবং তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
আলাদিনের চেরাগ ও কোটি টাকার সম্পদ
অনুসন্ধানে জানা যায়, কিশোরগঞ্জের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে বড় হওয়া হাবিবুর রহমান নারায়ণগঞ্জে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ হাতে পান। একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী হয়েও রাজধানী সংলগ্ন এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ। বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জের ‘ভূমিপল্লী’ এলাকার ৩ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাড়িতে তার একটি পাঁচতলা ভবনের পুরো ফ্লোর রয়েছে, যেখানে রয়েছে চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। যার বর্তমান বাজার মূল্য অন্তত ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি চারতলা ভবনসহ নিজ এলাকায় এবং শ্বশুর ও স্ত্রীর নামে-বেনামে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাত অব্দি অফিস ও জাল-জালিয়াতির আখড়া
সরকারি নিয়মানুযায়ী বিকাল ৪টায় অফিস বন্ধ করার কথা থাকলেও হাবিবুর রহমান প্রায়ই সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অফিস খোলা রাখেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বাড়তি সময়ে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কোনো কাজ না হলেও, প্রভাবশালীদের সাথে যোগসাজশ করে জমির জাল-জালিয়াতি ও বড় ধরণের ঘুষের গোপন লেনদেন সম্পন্ন করা হয়।
তথ্য সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিক লাঞ্ছিত, হাসপাতালে ভর্তি
গত ২ জুন সন্ধ্যায় এমনই এক অনৈতিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে দুই সংবাদকর্মীর ওপর চড়াও হন হাবিবুর রহমান ও তার সহযোগীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং এক পর্যায়ে একজন ফটো সাংবাদিকের শার্টের কলার চেপে ধরে বুকে আঘাত করেন ও হাত মুচড়ে দেন। আহত সাংবাদিক বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের খানপুর ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে বন্দর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের হেনস্তা করতে স্থানীয় দালালদেরও নির্দেশ দেন।
রাজনৈতিক ভোলবদল ও দাপট
অভিযোগ রয়েছে, হাবিবুর রহমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ভোল পাল্টাতে পটু। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি প্রভাবশালী সাবেক এমপি শামীম ওসমানকে ‘উকিল শ্বশুর’ পরিচয় দিয়ে দাপট দেখাতেন। আবার ৫ আগস্টের পর তিনি বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের নাম ভাঙিয়ে নিজের অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, নিজের দুর্নীতির পথ সুগম করতেই তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির নাম ব্যবহার করেন।
দুদক ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
ভূমি অফিসে আসা সাধারণ গ্রাহকদের দাবি, হাবিবুর রহমানের একক আধিপত্য ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে কীভাবে তিনি একাধিক আলিশান ভবনের মালিক হলেন, তা নিবিড়ভাবে তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ।
বক্তব্য এড়ালেন অভিযুক্ত
এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং বিষয়টি এড়িয়ে যান। বর্তমানে বন্দর থানা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।