সেপ্টেম্বরে খুলছে পঞ্চবটি-মুক্তারপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ডিসেম্বরে পুরো প্রকল্প শেষ
নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের যানজটের ভোগান্তি কমাতে বহুল প্রতীক্ষিত পঞ্চবটি-মুক্তারপুর ৬ লেনের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মূল উড়াল অংশ আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হতে পারে। আর আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ের এই পুরো প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। একই সাথে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল থেকে আসা দক্ষিণাঞ্চলগামী যানবাহনগুলোকে আর ঢাকার মূল শহরে প্রবেশ করতে হবে না। এই এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করে সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা সময় ও পরিবহন খরচ উভয়ই বিপুল পরিমাণে কমিয়ে আনবে।
কাজের অগ্রগতি ও ব্যয়:
প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার প্রকৌশলী জহুরুল হক জানান, ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৯৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এলিভেটেড অংশের কাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হয়ে এখন বিটুমিনের কাজ চলছে, যা আগামী এক মাসের মধ্যে শেষ হবে। এরপর সংযোগের কাজ সম্পন্ন করতে আরও প্রায় দুই মাস সময় লাগবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, "সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এলিভেটেড অংশটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন হবে।"
উল্লেখ্য, শুরুতে প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫ সালের জুন এবং ব্যয় ২ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা ধরা হলেও বিভিন্ন জটিলতায় মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয় এবং সংশোধিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সংশোধিত সময় কিছুটা অতিক্রম করলেও চলতি বছরের শেষ নাগাদ কাজ পুরোপুরি শেষ হচ্ছে।
প্রকল্পের কারিগরি দিক ও নকশা:
প্রকল্প সূত্র জানায়, এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি পঞ্চবটি থেকে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু পর্যন্ত ২ দশমিক ৮০ কিলোমিটার মূল উড়াল অংশসহ ৬টি র্যাম্প নিয়ে মোট ৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশ পঞ্চবটি থেকে কাশিপুর পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কের ওপর দিয়ে এবং ২ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার অংশ কাশিপুর থেকে চর সৈয়দপুর পর্যন্ত নিচু ভূমির ওপর নির্মিত হচ্ছে।
এছাড়াও প্রকল্পের আওতায়:
- ভূমি সমান্তরাল (অ্যাটগ্রেড) ৭ কিলোমিটার সড়ক দুই লেনে উন্নয়ন করা হচ্ছে।
- তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে।
- যানজট এড়াতে পঞ্চবটি মোড় থেকে ফতুল্লা ও চাষাঢ়ার দিকে ৩১০ মিটার করে ৬ লেনের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে।
- মুক্তারপুর সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে ৪৪৩ মিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে।
- চর সৈয়দপুরে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর সংযোগস্থলে একটি গোলচত্বর, ৪টি টোল প্লাজা এবং ৬টি ওজন পরিমাপক স্টেশন থাকবে। নিচের সড়কটি টোলমুক্ত থাকলেও এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারে টোল দিতে হবে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব:
এই সড়কের দুই পাশে বিসিক শিল্পনগরীসহ প্রায় এক হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও হিমাগার রয়েছে, যেখানে প্রায় চার লাখ শ্রমিক কর্মরত। এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে এই অঞ্চলের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা আরও সহজ ও গতিশীল হবে।
তবে প্রকল্পটির বাণিজ্যিক প্রভাব নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন নারায়ণগঞ্জ বিসিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বিকেএমইএর সহসভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল। তিনি বলেন, "যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে আগে থেকেই যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় শুধুমাত্র এই প্রকল্পের কারণে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে রাতারাতি বিশাল কোনো পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি না।"