কামেসীকে এমপি বানাতে ব্যর্থ রিয়াদ-সেন্টু বহাল তবিয়তে, ফেরার অপেক্ষায় গিয়াস-শাহআলম!
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ফতুল্লায় নব্য বিএনপি নেতাকর্মীদের দাপটে চরম অবহেলিত ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন দলের রাজপথের পরীক্ষিতরা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ সংগঠনের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি বিএনপির অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও সদ্যসমাপ্ত জোটবদ্ধ নির্বাচনে বিএনপির হাইকমান্ড আসনটি শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম মনোনীত প্রার্থী মুফতি মনির হোসেন কাসেমীকে ছেড়ে দেয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও আসনটি ছেড়ে দেয় তাদের শরিক দল এনসিপি-কে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন এনসিপির তরুণ প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল আমিন। ধানের শীষ প্রতীক না থাকায় এবং স্থানীয় কোনো নেতা মনোনয়ন না পাওয়ায় তৃণমূলের বড় একটি অংশ হতাশায় নিমজ্জিত হয়।
এই পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য শিল্পপতি আলহাজ্ব মোহাম্মদ শাহ আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে নামেন। ফলশ্রুতিতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির হাইকমান্ড এই দুই শীর্ষ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জনপ্রিয়তায় কর্মী সংকটে পড়া খেজুর গাছ প্রতীকের প্রার্থী মুফতি মনির হোসেন কাসেমী নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বিতর্কিত নেতাদের শরণাপন্ন হন। চাঁদাবাজির অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান হওয়া ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরুল আলম সেন্টুর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অনুরোধ করেন কাসেমী। তার সুপারিশে তাদের প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, রিয়াদ ও সেন্টুর ‘প্রেসক্রিপশনে’ নির্বাচনে গিয়াসউদ্দিনের (ফুটবল) ও শাহ আলমের (হরিণ) প্রতীকের পক্ষে কাজ করা তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের দল থেকে বহিষ্কার বা কোণঠাসা করা হয়। ৫ আগস্টের পর ফতুল্লা জুড়ে রিয়াদ বাহিনীর অপরাধ ও তাণ্ডবের কারণে সাধারণ ভোটারদের মাঝে চরম ভীতি কাজ করছিল। ফলে সাধারণ মানুষ খেজুর গাছের পরিবর্তে শাপলা কলি প্রতীকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। রিয়াদ ও সেন্টুর মানবপ্রাচীর ভেদ করে কাসেমী সাধারণ ভোটারের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন এবং নিজের কেন্দ্রের ভোটেই পরাজিত হন। ফলে বিএনপির সমর্থন পেয়েও কাসেমীর বিশাল ভরাডুবি ঘটে এবং এমপি নির্বাচিত হন এনসিপির তরুণ প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল আমিন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফতুল্লা থানা বিএনপির এক নেতা জানান, নির্বাচনের পর মনির হোসেন কাসেমী অন্তরালে চলে গেলেও তার আশীর্বাদে দলে ফেরা রিয়াদ ও সেন্টুর অনুসারীরা এখন এলাকায় ‘বহাল তবিয়তে’ আছেন। ক্ষমতা গ্রহণের একশ দিন পার না হতেই ফতুল্লার মামলা বাণিজ্য, সন্ত্রাসী লালন, জুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণ, হাট-ঘাট ও জমি দখল, টেন্ডারবাজি এবং মাদক সেক্টর এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এক সময় যাদের পকেটে অটোরিকশার ভাড়া ছিল না, তারা এখন মার্সিডিজ গাড়ি হাঁকিয়ে চলছেন।
বিপরীতে, নির্বাচনে গিয়াসউদ্দিন ও শাহ আলমের পক্ষে কাজ করা বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা এখন নিজ দলেই ‘রোহিঙ্গাদের মতো’ আশ্রিত ও চরম অবহেলিত। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তাদের বাড়িঘরে হামলা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলাতেও তাদের আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে গিয়াসউদ্দিন ও শাহ আলম পন্থী নেতাকর্মীরা ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকীসহ দলীয় কর্মসূচিগুলো আলাদাভাবে পালন করছেন। নির্বাচনের পর এই দুই শীর্ষ নেতা রাজনৈতিকভাবে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখলেও তৃণমূলের কর্মীরা আশা ছাড়েননি। তারা বিএনপির হাইকমান্ডের দিকে চেয়ে আছেন—কবে তাদের প্রিয় নেতা গিয়াসউদ্দিন ও শাহ আলমের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হবে এবং আবারও তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফতুল্লার রাজনীতির মাঠে ফিরবেন।