৩৯১ দিন পর চুনকা কুটিরে আইভী: নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ
দীর্ঘ ১ বছর ২৬ দিন (৩৯১ দিন) কারাজীবন শেষে অবশেষে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু কারামুক্তি নয়, বরং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন এক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
কারামুক্তি ও আবেগঘন প্রত্যাবর্তন
গত বুধবার (৩ জুন) রাত ১০টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান আইভী। কারাফটকে পরিবারের সদস্য, আইনজীবী ও ঘনিষ্ঠ স্বজনরা তাকে স্বাগত জানান।
নারায়ণগঞ্জে পৌঁছেই আইভী প্রথমে ছুটে যান মাসদাইর কেন্দ্রীয় সিটি কবরস্থানে। সেখানে তিনি বাবা ভাষাসৈনিক ও সাবেক জনপ্রতিনিধি আলী আহাম্মদ চুনকা, মা মমতাজ বেগম এবং প্রয়াত ছোট ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন। পরে গভীর রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি শহরের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত তার পারিবারিক বাসভবন ‘চুনকা কুটিরে’ পৌঁছান। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় পর তাকে কাছে পেয়ে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন, তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
পুলিশের সতর্কতা ও আত্মসমর্পণ অধ্যায়
আইভীর আগমনকে কেন্দ্র করে শহরের সাইনবোর্ড, চাষাঢ়া, দেওভোগসহ বিভিন্ন প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। চুনকা কুটিরের সামনেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি ছিল। প্রশাসন জানায়, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই এই সতর্ক অবস্থান।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৯ মে ভোরে হাজারও সমর্থকের উপস্থিতিতে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন আইভী। সে সময় তার সমর্থকদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা।
১২ মামলায় ‘আইনি হয়রানি’ ও উচ্চ আদালতের রিট
গ্রেপ্তারের পর ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে একের পর এক মোট ১২টি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এক মামলায় জামিন পেলেই অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর এই প্রক্রিয়াকে আইভীর আইনজীবীরা ‘আইনি হয়রানি’ বলে আখ্যা দেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে হাইকোর্ট থেকে জামিন মিললেও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে চেম্বার আদালত ও আপিল বিভাগে তা বারবার ঝুলে যায়। পরবর্তীতে এই ধারাবাহিক গ্রেপ্তার দেখানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। রিটের শুনানি শেষে আদালত আইভীকে নতুন কোনো মামলায় হয়রানি বা গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দেন এবং রুল জারি করেন। সবশেষে ১২টি মামলায় জামিন আপিল বিভাগে বহাল থাকায় তার মুক্তির পথ সুগম হয়।
আইভীর প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেন:
"আমরা বিশ্বাস করি, আইভীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আদালত আমাদের যুক্তি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন এবং হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের ধারাবাহিক সিদ্ধান্তে তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন। ঈদের ছুটি ও বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগলেও অবশেষে তিনি মুক্ত হয়েছেন।"
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভী ফ্যাক্টর
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী নাম। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং পরবর্তীতে টানা তিনবার সিটি করপোরেশনের (নাসিক) মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দলীয় পরিচয়ের বাইরেও নাগরিক সুবিধা, সুশাসন এবং উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে তার একটি নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, যা তাকে স্থানীয় অন্য নেতাদের চেয়ে আলাদা করেছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
কারামুক্তির পর আইভীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। তার আইনজীবীর দাবি, আইভী ভবিষ্যতে আবারও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে আইভীর এই প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে বিরোধীদের মতে, চলমান মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
দীর্ঘ আইনি লড়াই আর অনিশ্চয়তা পেরিয়ে চুনকা কুটিরে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর এই প্রত্যাবর্তন নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।