জামিন মিললেও কারাগারেই কাটাতে হবে আইভির ঈদ
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত ও প্রভাবশালী মুখ, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সব মামলায় জামিন বহাল রেখেছেন আদালত।
গত ১৭ মে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের আদালত আইভীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ১২টি মামলায় আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত জামিন বহাল রাখার এই আদেশ দেন। তবে সব মামলায় জামিন পেলেও আইনি কিছু জটিলতার কারণে সহসাই মুক্তি পাচ্ছেন না তিনি। ফলে এবারও তাঁকে কারাগারের ভেতরেই ঈদের দিনটি কাটাতে হচ্ছে।
বর্তমানে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন সাবেক এই মেয়র। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর পর থেকেই তাঁর কারাজীবন শুরু হয়। প্রায় এক বছর ধরে বন্দি জীবন কাটানো আইভী গত কোরবানির ঈদের পর এবারও ঈদের সময় কারাগারের সীমাবদ্ধ পরিবেশেই থাকছেন। ফলে এক সময়ের ব্যস্ত রাজনৈতিক জীবন আর জনসমাগমে ঘেরা উৎসব এখন তাঁর জন্য বন্দিত্বের নিঃসঙ্গ বাস্তবতা।
আইভীর গ্রেপ্তারের ঘটনাটি ছিল বেশ নাটকীয় ও আলোচিত। গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার নিজ বাসভবন ‘চুনকা কুটি’ থেকে তাঁকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে রাতভর বাড়ির চারপাশে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে সমর্থকরা বাড়ির সামনে ভিড় করেন এবং একপর্যায়ে আশপাশের সড়কেও অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাড়তি সতর্কতা ও তৎপরতা চালাতে হয়। দীর্ঘ আলোচনা ও টানটান পরিস্থিতির পর ভোরের দিকে আইভী নিজেই পুলিশের গাড়িতে ওঠেন।
এদিকে সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর তাঁর সম্ভাব্য মুক্তির খবর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচন ঘিরে আইভীকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি শুধু আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবেই পরিচিত নন, বরং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণেও নগরবাসীর বড় একটি অংশের সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। পরে সিটি কর্পোরেশন গঠনের পর টানা তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা থাকলেও আইভীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এখনো উল্লেখযোগ্য। নগর উন্নয়ন, তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা তাকে অন্যদের তুলনায় আলাদা অবস্থানে রেখেছে। ফলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য লড়াই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাঁর সম্ভাব্য মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সমর্থকদের মধ্যেও নতুন করে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই মনে করছেন, আইভী মাঠে ফিরলে সাংগঠনিক কার্যক্রমেও গতি ফিরে আসবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরেও বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ ও হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে বিএনপির ভেতরে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী নিয়ে একাধিক নাম আলোচনায় রয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে নাসিক প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। যদিও নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে, তবে নগরবাসীর একাংশের অভিযোগ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে আগের মতো জবাবদিহিতা নেই। জলাবদ্ধতা, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো তফসিল ঘোষণা না করলেও নাসিককে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। আর সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। যদিও একাধিক মামলায় জামিন পেয়েছেন তিনি, তবুও এবার তাঁর ঈদ কাটছে কারাগারের ভেতরেই। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায় স্পষ্ট, তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরেই ইতোমধ্যে বদলাতে শুরু করেছে নাসিকের রাজনৈতিক সমীকরণ।