ময়লার ভাগাড়ে মাসদাইরের মিনি পার্ক, দখলে নষ্ট হচ্ছে অবকাঠামো
নারায়ণগঞ্জ নগরীর মাসদাইরের গলাচিপা বোয়ালিয়া খাল সড়কের (মুক্তিযোদ্ধা সড়ক) পাশে অবস্থিত সিটি করপোরেশনের মিনি পার্কটি এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। তীব্র দুর্গন্ধে পার্কের পাশ দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, পার্কের একটি বড় অংশ অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে ইট, বালু, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী দিয়ে। পাশাপাশি ভাঙারি ব্যবসায়ী ও আশপাশের দোকানিরাও পার্কের জায়গা নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করছেন, যার ফলে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পার্কটির বিভিন্ন অবকাঠামো।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাসদাইরের গলাচিপা সংলগ্ন বোয়ালিয়া খাল সড়কের পূর্ব পাশে পার্কটির অবস্থান। এর এক পাশে পানির ট্যাংকি সড়ক ও অন্য পাশে মাসদাইর বাজার। একসময় সকালে ও বিকেলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা এবং বয়স্কদের আড্ডা ও অবসর কাটানোর অন্যতম স্থান ছিল এটি। বাজনাপাড়া, লিচুবাগ, দাতাসড়ক, ভূঁইয়ারবাগসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ চাষাড়া যাতায়াতের জন্য এই ব্যস্ত সড়কটি ব্যবহার করেন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের নজরদারির অভাব এবং স্থানীয়দের অসচেতনতার কারণে পার্কটি এখন আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে।
পার্কসংলগ্ন ব্যাংক কলোনির বাসিন্দা মো. রাজ্জাক হোসেন (৫৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দুই বছর ধইরা হমানে (টানা) লোকজনে পার্কটাতে ময়লা ফ্যালে। বাসাবাড়ি থাইকা ময়লা নেওনের খরচ ১২০ থাইকা ২৫০ টাকা দেওন লাগে। এই টাকার লাইগাই লোকজন এনে পার্কে ময়লা ফালায়া যায়।”
পার্কের এক কোণে পুরি-সিঙ্গারা তৈরির কাজে ব্যস্ত বাংলা হোটেলের কর্মচারীরাও জানান, সকালে সিটি করপোরেশনের ট্রাক এসে ময়লা সরিয়ে নিলেও দিনের বাকি সময়ে স্থানীয়রা আবার সেখানে আবর্জনা ফেলেন। নির্ধারিত স্থানে ময়লা জমতে জমতে একসময় তা পুরো পার্কে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আশপাশের পরিবেশ অসহনীয় হয়ে ওঠে।
ঘটনাস্থলে বালতি ভর্তি গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলতে আসা রহিমা খাতুন নামের এক নারী জানান, লিচুবাগ, বাজনাপাড়াসহ আশপাশের এলাকার অনেক মানুষই এখানে ময়লা ফেলেন। নিজের কাজ যে ভুল, সেটি স্বীকার করে তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। ময়লাওলারে টাকা দিতে পারি না, তাই এখানে ময়লা ফালাই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক দশক আগে বোয়ালিয়া খাল ভরাট করে লিচুবাগ মোড় থেকে গলাচিপা পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পার্কটি তৈরি করেছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)। কিন্তু এরপর থেকে পার্কটির রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “অনেক সুন্দর করে পার্কটা বানানো হয়েছিল। এখন ইট-বালু রাখতে রাখতে সব ভেঙে গেছে। যারা বাড়িঘর করছে, তারা এখানেই নির্মাণসামগ্রী রাখছে। এতে পার্কের সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে। এখনই ব্যবস্থা নিলে ময়লা ফেলা ও দখল দুটোই বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু সিটি করপোরেশনের কেউ এখানে আসে না, দেখেও না।”
এলাকাবাসীর মতে, বহুব্যয়ে নির্মিত পরিকল্পিত পার্কটি একসময় বিনোদন ও স্বস্তির জায়গা থাকলেও এখন এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই দায়। ব্যস্ত মাসদাইর-গলাচিপা সড়কে প্রতি মিনিটে অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। ময়লার কারণে সড়কের একাংশ দখল হয়ে যাওয়ায় প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হয়, যা বর্ষা মৌসুমে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলমগীর হিরণ ‘নারায়ণগঞ্জ ভয়েস’-কে বলেন, “ভোর চারটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে রাস্তার সব ময়লা সরিয়ে নেওয়া হয়। বোয়ালিয়া পার্কে আমরা দুইবার অভিযান চালিয়েছি। লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্কও করা হয়েছে। তারপরও তারা নিজেরাই এলাকা নোংরা করছে। সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে এর প্রতিকার করা কঠিন।”
তবে নারায়ণগঞ্জ ভয়েস-এর অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সিটি করপোরেশনের দাবি করা সময়ের সাথে বাস্তবতার মিল নেই। রোববার ও মঙ্গলবার সকালে সড়ক থেকে ময়লা সংগ্রহের ট্রাক সকাল সাড়ে নয়টার পর আসতে দেখা গেছে, যা কর্তৃপক্ষের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, পার্কটিকে দখল ও ময়ূক্ত করে পূর্বের বিনোদনমুখর পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে সিটি করপোরেশনকে দ্রুত কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।