ডিসি ও এসপির কঠোর তদারকিতে নারায়ণগঞ্জে শান্তিপূর্ণ ঈদ উদযাপন: মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূলে বিশেষ অভিযান অব্যাহত
জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের কঠোর তদারকি, সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই নারায়ণগঞ্জে পবিত্র ঈদুল আজহা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে। একই সঙ্গে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূলে সরকারের ঘোষিত 'জিরো টলারেন্স' নীতির আলোকে বিশেষ অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে জেলা প্রশাসন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের নেতৃত্বে পরিচালিত এ কার্যক্রমে জেলা পুলিশ, র্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, আনসার, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।
নিরাপদ ঈদ ও দ্রুত বর্জ্য অপসারণ
ঈদ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন ঈদগাহ ও মসজিদে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। ঈদকে কেন্দ্র করে জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ঈদগাহ, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, কোরবানির পশুর হাট ও জনসমাগমস্থলে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধ দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন।
পাশাপাশি, কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ফলে জনভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ঈদের দিন ও পরবর্তী সময়ে জেলার কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা, বিশৃঙ্খলা কিংবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটেনি।
অপরাধীদের প্রতি জেলা প্রশাসকের হুঁশিয়ারি
এক সাক্ষাৎকারে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন,
"মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। নারায়ণগঞ্জকে এসব অপরাধমুক্ত করতে জেলা প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনো অপরাধীই ছাড় পাবে না, সে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন।"
তিনি জানান, বস্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল, সচেতনতামূলক সভা ও উঠান বৈঠক পরিচালনা করা হচ্ছে। যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে পরিবার ও সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করলে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, মাদকই অধিকাংশ অপরাধের মূল উৎস। তাই মাদক নির্মূলে সফল হলে অপরাধমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়ার পথ অনেকটাই সুগম হবে। চাঁদাবাজি প্রতিরোধে পরিবহন খাত, বাজার ও নির্মাণখাতে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
কিশোর গ্যাং ও মাদক স্পটে পুলিশের কঠোর অবস্থান
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সি বলেন, জেলার চিহ্নিত মাদক স্পট ও চাঁদাবাজ চক্রের তালিকা হালনাগাদ করে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। কিশোর গ্যাংমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়ে তুলতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধে জড়িত কিশোরদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের সংশোধনের সুযোগও রাখা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানান, শুধু অভিযান নয়, মাদকাসক্তদের জন্য নিরাময় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সমন্বিত উদ্যোগে আশাবাদী সুশীল সমাজ
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি উপজেলায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, হটলাইন সেবা চালু, গোপন তথ্যদাতাদের পুরস্কৃতকরণ এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির পরিশেষে বলেন,
"অপরাধ দমনে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই আমাদের মূল লক্ষ্য। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকারি দপ্তর বা রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারবে না। আমরা একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও বিনিয়োগবান্ধব নারায়ণগঞ্জ গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের এই সমন্বিত উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ উদযাপন সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং দমনে চলমান এই অভিযান নারায়ণগঞ্জের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং একটি নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।