নগরের বাইরে
কাঠগড়ায় বিএনপি নেতা ইকবাল!
আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থা (Status quo)কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডে মিতালী মার্কেট সংলগ্ন কোটি কোটি টাকা মূল্যের পৈত্রিক সম্পত্তি জবরদখল চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, নিজে পর্দার আড়ালে থেকে পুরো ঘটনার মূল কলকাঠি নাড়ছেন এই প্রভাবশালী নেতা, আর মাঠে থেকে জমি দখলের মিশন বাস্তবায়ন করছেন তারই আপন বোনজামাই, যিনি এই ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগের ১১ নম্বর অভিযুক্ত।
আদালতের নির্দেশ অমান্য করে গত ২৭ মে সকালে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মিতালী মার্কেট কমিটির ব্যানারে এই জমি দখলের চেষ্টা চালানো হয় বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। এই বিষয়ে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি জমি দখলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও নানা চাঞ্চল্যকর যুক্তি দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন খোদ্দুঘোষ মৌজার আরএস বিভিন্ন দাগের ৯৩ শতাংশ ৬৬ পয়েন্ট জমি পৈত্রিক ও ওয়ারিশ সূত্রে মালিক তানভীর ইসলাম গংরা। সেখানে তারা বহুতল ইমারত নির্মাণ করে শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু এই জমির ওপর দীর্ঘদিন ধরে লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে সাইনবোর্ড মিতালী মার্কেট কমিটির পেছনে থাকা সিন্ডিকেটের।
আইনি লড়াইয়ে টিকতে না পেরে এবং দেওয়ানী আদালতে (মামলা নং-২৪৮/২০২১) এই জমির ওপর ‘স্থিতাবস্থা’ জারির পর ওই চক্রটি ভিন্ন কৌশল নেন। রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনের আপন বোনজামাই মুক্তার হোসেনকে (অভিযোগের ১১ নং অভিযুক্ত) সামনে এগিয়ে দেওয়া হয়। গত ২৭ মে সকাল ৭টার দিকে ওই চক্রের প্রত্যক্ষ মদদে ২০/২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল রামদা, চাপাতি, লোহার রড ও সাবল নিয়ে মিতালী মার্কেট সংলগ্ন উক্ত জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে টিনের বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করে। মালিকপক্ষ বাধা দিলে তারা বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
গত ২৭ তারিখ সকালে মিতালী মার্কেট সংলগ্ন জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রথমে ক্ষোভ প্রকাশ করে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, "জমি দখল কাকে বলে? যার জমি সে বাউন্ডারি দিতে গেলে কি জমি দখল হয়?"
আমাদের কাছে প্রাপ্ত তথ্য মতে, তানভীর ইসলামরা এই জমির মূল মালিক এবং তারা ১১ জনের নামে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় জমি দখলের অভিযোগও করেছে, যেখানে ১১ নম্বর আসামী করা হয়েছে আপনার বোনজামাই মুক্তার হোসেনকে—এমন তথ্যের জবাবে ইকবাল হোসেন বলেন, "জমি দখলের প্রশ্নই আসে না। আপনারা তদন্ত করে দেখেন। একটি পক্ষ তাদের জমির কাগজপত্র নিয়ে আমার কাছে আসে। দেখতে পাই কাগজপত্রে তারা জমির মালিক।"
তখন আমাদের প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, তানভীররাও তো কাগজপত্র দেখিয়ে দাবি করছে যে তারাই এই জমির মূল মালিক। জবাবে বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেন তার ল্যান্ড ব্যবসার দাপট দেখিয়ে বলেন, "আমি তো ভাই ল্যান্ডের ব্যবসা করি ২০০২ সাল থেকে। ৪ হাজারেরও অধিক প্লট বিক্রি করেছি। কিছু তো বুঝি।"
তবে এই জমির বিষয়ে যে বিজ্ঞ আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা 'স্ট্যাটাস কু' (স্থিতাবস্থা) জারি আছে, সেটি তিনি জানেন কি না—এমন প্রশ্নে ইকবাল হোসেন বলেন, "না, এটা আমার জানা নেই।"
আদালতের নিষেধাজ্ঞা না জেনেই এই দখল প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়েছেন কি না—প্রতিবেদকের এই তীক্ষ্ণ প্রশ্নের উত্তরে তিনি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলেন, "আমি সম্পৃক্ত হয়েছি আপনি জানলেন কিভাবে?"
উত্তরে প্রতিবেদক তাকে মনে করিয়ে দেন যে, তিনি নিজেই তো স্বীকার করলেন একটি পক্ষ উনার কাছে এসেছে এবং উনি তাদের কাগজপত্র দেখেছেন। তাছাড়া, তানভীররা ওইদিনই সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন যেখানে ১১ নম্বর আসামী খোদ উনার বোনজামাই মুক্তার হোসেন। জবাবে ইকবাল হোসেন সাফ জানিয়ে দেন, "প্রশ্নই উঠে না। একটি পক্ষ এসে কাগজ দেখিয়ে বলেছে তারা মালিক। এখন ভেতরে যদি অন্য কিছু থাকে সেটা তো আমার বিষয় না। অন্য কেউ যদি মালিক হয়, তারা আইনের দ্বারস্থ হোক, আদালতের দ্বারস্থ হোক বা গ্রাম্য সালিসে বসুক।"
এই ঘটনায় কাজী তানভীর ইসলাম বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২০/২৫ জনের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।