নগরের বাইরে
নারায়ণগঞ্জে পরিচ্ছন্নতা অভিযান: খাল থেকে ময়লা এখন রাস্তার ওপর, জনমনে প্রশ্ন — এটি কি কেবলই 'ফটোসেশন'?
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে ঘটা করে শুরু হওয়া পরিচ্ছন্নতা অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ধুমধাম করে খালের ময়লা পরিষ্কার কার্যক্রম উদ্বোধন করা হলেও আজ বুধবার সকালে সেই ময়লা খালের পাড় ও রাস্তার ওপর স্তূপ করে রাখা অবস্থায় দেখা গেছে। এতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল হওয়ার বদলে উল্টো জনসাধারণের চলাচলে চরম ভোগান্তি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে এই বিশেষ অভিযানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি জানিয়েছিলেন, বর্ষা মৌসুমের আগেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিডি ক্লিন, স্কাউটস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের শপথ পাঠ করিয়ে নলখালি, বাগডুমারি ও ওয়াবদার খালে প্রাথমিকভাবে পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করা হয়। প্রায় ৮ থেকে ৮.৫ কিলোমিটার খাল পরিষ্কার ও খননের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথাও সেখানে ঘোষণা করা হয়।
উদ্বোধনের মাত্র একদিন পর আজ বুধবার সকাল সাড়ে দশটায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। খালের ভেতর থেকে যে পচা আবর্জনা ও গাছ গাছারি তোলা হয়েছিল, তা যথাসময়ে সরিয়ে না নেওয়ায় সেগুলো এখন খালের পাড় ঘেঁষে রাস্তার ওপর স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। রোদ বাড়ার সাথে সাথে ভেজা ময়লা থেকে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, যা পথচারী ও পাশের স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য রীতিমতো অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানবাহন চলাচলেও সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র জট।
স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "গতকাল ডিসি সাহেব আসলেন, অনেক লোক আসলো, ভিডিও-ছবি তোলা হলো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। খাল থেকে ময়লা তুলে রাস্তার ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। এতে রাস্তা আরও নোংরা হচ্ছে, আবার বৃষ্টি হলে এই ময়লা ধুয়ে ফের খালেই পড়বে। এটা কি বাস্তব পরিষ্কার নাকি কেবল লোক দেখানো ফটোসেশন?"
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, উদ্বোধনের দিন এত আয়োজন করা হলে বর্জ্য অপসারণের জন্য ডাম্পিং ট্রাক বা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা কেন রাখা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান শুধু উদ্বোধন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, এরপর কোনো তদারকি নেই।
উদ্বোধনী দিনে জেলা প্রশাসক শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত চ্যানেলগুলো সচল রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। কিন্তু খোদ সদর উপজেলার পাশের খালের এই চরম অব্যবস্থাপনা প্রশাসনের তদারকি নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। ওপর থেকে কিছু ময়লা পরিষ্কার করা হলেও খালের তলদেশের জমাটবদ্ধ বর্জ্য সরানো হয়নি বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। ময়লা পরিবহনের জন্য কোনো ডাম্পিং ট্রাক বা স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবও এ অভিযানে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
সচেতন মহলের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় কেবল উদ্বোধন বা মিডিয়া প্রচারণাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি অভিযানের পর বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করা এবং খালের গভীরতা বজায় রেখে পানি প্রবাহ সচল রাখা সবচেয়ে জরুরি। দ্রুত এই ময়লার স্তূপ সরানো না হলে মশার উপদ্রব কমার বদলে উল্টো আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ হওয়ার পর এই অব্যবস্থাপনা দূর করতে কী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয় নাকি এই অভিযান সত্যিই কেবল একটি 'ফটোসেশন' হিসেবেই থেকে যায়।