মহানগর
রাজনীতিতে বন্দি ফুটপাত: ১৩ এপ্রিল কি মুক্ত হবে নারায়ণগঞ্জ?
নারায়ণগঞ্জ শহরে ফুটপাত দখল ও হকার সমস্যাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। সমাধানের চেয়ে বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিই হয়েছে বেশি। ফলে, এ নিয়ে একাধিকবার সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও ফুটপাতে নির্বিঘ্নে হাঁটার স্বস্তি পাননি নগরবাসী।
স্থানীয়রা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে শহরে হকারের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। তবে নতুন সরকার গঠনের পর এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট আবুল কালাম।
প্রশাসনের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের পর আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে হকার উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি জানিয়েছেন, শহরের প্রধান সড়কে কোনো হকার বসতে দেওয়া হবে না। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে তিনি নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।
নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে হকারদের দখলে রয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন লাখো মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চাষাঢ়া থেকে নিতাইগঞ্জ, দুই নম্বর রেলগেট হয়ে কালীরবাজার ও খানপুর পর্যন্ত পুরো শহর ঘুরতে রিকশায় সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগার কথা। কিন্তু হকারদের দখলের কারণে কখনো কখনো দুই ঘণ্টাও লেগে যায়।
আগে কেবল ফুটপাতে বসলেও এখন রাস্তারও বড় একটি অংশে চৌকি ও ভ্যানগাড়ি নিয়ে বসছেন হকাররা। বর্তমানে চাষাঢ়া সোনালী ব্যাংক এলাকা থেকে কালীরবাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশ কার্যত হকারদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ফুটপাত দিয়ে না হাঁটতে পারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানজটে ভোগান্তিও।
বিশেষ করে চাষাঢ়া থেকে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সড়কের দুই পাশে শতাধিক হকার ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছেন। ফলে পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে জটলা, বাড়ছে পকেটমার-ছিনতাইয়ের ঘটনাও।
তবে, হকার উচ্ছেদের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি এ সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। হামলায় নেতৃত্ব দেন সেইসময়কার আওয়ামী লীগের এমপি শামীম ওসমান। ওইদিন আইভী ছাড়াও সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতাসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর স্থায়ীভাবে হকারমুক্ত করা সম্ভব হয়নি বঙ্গবন্ধু সড়ক।
এদিকে, শহরের প্রায় সব সড়কেই হকার বসানোকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা-কর্মী এবং সিটি কর্পোরেশনের অসাধু কর্মচারীরা এর সঙ্গে জড়িত।
সূত্র বলছে, বঙ্গবন্ধু সড়কের বিভিন্ন অংশে ভোর পাঁচটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অন্তত হাজারখানেক স্পট ভাড়া দিয়ে চাঁদা আদায় করা হয়। ওই জায়গাগুলোতে হকাররা বসে ব্যবসা চালান। দুই নম্বর গেট, উকিলপাড়া, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সামনে ও মীর জুমলা সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টাভিত্তিক ও দৈনিক ভিত্তিতে জায়গা বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত কয়েক দফায় হাতবদল হয় ফুটপাত ও সড়কের জায়গা।
হকারদের অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয় এবং হকার নেতাদেরও মাসোহারা দিতে হয়। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধেও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নাসিক প্রশাসকের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১৩ এপ্রিল শুরু হতে যাচ্ছে উচ্ছেদ অভিযান। তবে স্থানীয়রা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এটি সহজ হবে না।
নগরবাসীর একাংশ আশা করছেন- এই উদ্যোগ সফল হলে যানজট কমবে, ফুটপাত দখলমুক্ত হবে। অন্যদিকে হকারদের একটি বড় অংশ উচ্ছেদ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে। বিশেষ করে পুনর্বাসন নিশ্চিত না হলে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা করছেন অনেকে।
সব মিলিয়ে ১৩ এপ্রিলের অভিযান নারায়ণগঞ্জ শহরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা- এটি কি স্থায়ী সমাধানের দিকে যাবে, নাকি আবারও পুরনো চিত্রে ফিরে যাবে- সেই প্রশ্ন এখন সবার মুখে।