মহানগর
নারায়ণগঞ্জে ওয়াসার পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ ও ময়লা: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে লাখো নগরবাসী
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সরবরাহকৃত পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ ও ময়লা আসায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে এই দূষিত পানি ব্যবহার করতে গিয়ে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে বাসা-বাড়ির নারী ও শিশুরা পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি কোনোভাবেই ব্যবহারের যোগ্য নয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানির গন্ধে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পানি ফুটিয়েও সেই উৎকট গন্ধ দূর করা যাচ্ছে না। রান্না তো দূরের কথা, এই পানি দিয়ে ওজু করা কিংবা গোসল করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় পানির সঙ্গে বালু, কেঁচো এবং নর্দমার আবর্জনা আসারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাসাবাড়িতে পানির প্রধান ব্যবহারকারী নারী ও শিশুরা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দূষিত পানি দিয়ে থালা-বাসন মাজা ও কাপড় ধোয়ার ফলে গৃহিণীদের হাতে-পায়ে চর্মরোগ ও চুলকানি দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, এই পানি পানের ফলে শিশুরা ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস ও টাইফয়েডের মতো মারাত্মক পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরো বাড়তে পারে।
নগরীর দেওভোগ এলাকার এক গৃহিণী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পানির যে গন্ধ, তাতে কল ছাড়লে বমি আসে। বাচ্চাদের এই পানি দিয়ে গোসল করালে সারা শরীরে রাশ উঠছে। আমরা বাধ্য হয়ে পানি কিনে বা মসজিদ থেকে টেনে খাচ্ছি, কিন্তু গোসল আর ধোয়া-মোছার জন্য তো এই দুর্গন্ধযুক্ত পানিই ব্যবহার করতে হচ্ছে। তাহলে কি আমরা মাসে মাসে বিল দিয়ে বিষ কিনে খাচ্ছি?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নগরীর অধিকাংশ পানির পাইপলাইন কয়েক দশকের পুরনো এবং জরাজীর্ণ। অনেক জায়গায় সুয়ারেজ লাইনের সাথে পানির লাইনের সংযোগ মিশে যাওয়ায় নর্দমার ময়লা ও মলমূত্র মিশ্রিত পানি লাইনে ঢুকে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে শোধনাগারে সঠিক প্রক্রিয়ায় পানি পরিশোধন না করার ফলেও এই দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। যদিও ঢাকা ওয়াসা থেকে এই দায়িত্ব নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (এনসিসি) হাতে ন্যস্ত হয়েছে, তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধীরগতির কারণে ভোগান্তি কমেনি।
দূষিত পানির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছে। চিকিৎসা খাতে তাদের বাড়তি খরচ হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে। স্থানীয়দের দাবি, কর্তৃপক্ষ কেবল বিল নেওয়ার সময় তৎপর থাকে, কিন্তু সেবার মান নিশ্চিত করতে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে জরাজীর্ণ পাইপলাইনগুলো সংস্কার করে সুয়ারেজ লাইন থেকে আলাদা করতে হবে। একই সাথে পানি শোধনাগারগুলোকে আধুনিকায়ন করে নাগরিকদের নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই দূষিত পানি বড় ধরনের মহামারি সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সচেতন মহল।
নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা চেয়ে নগরবাসী এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।