মহানগর
গুমের পর হত্যার অভিযোগ: পলাতক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রানা
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ইসদাইরের মাহফুজুর রহমান শুভ নামে এক যুবককে অপহরণের অভিযোগে মামলা হয়েছিল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এবার ওই যুবকের মরদেহ শনাক্ত হলে সঙ্গে হত্যার অভিযোগও যুক্ত হয়েছে। এদিকে, অপহরণের পর নির্যাতনে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সাখাওয়াত রানা পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফতুল্লা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন বলেন, “মামলায় জড়িত সকল আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
গত ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় ফতুল্লার ইসদাইর রেললাইন এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হন ২১ বছর বয়সী যুবক শুভ। সে পূর্ব ইসদাইর রসুলবাগের ঝুট ব্যবসায়ী মো. সোহেলের ছেলে।
রোববার সকালে পরিবারের লোকজন পুলিশের মোবাইলে তোলা লাশের ছবি দেখে তা শুভর বলে শনাক্ত করেন বাবা সোহেল ও মা মাকসুদা বেগম।
অপহরণের পরদিন ৩০ মার্চ সকালেই মরদেহটি উদ্ধার হয় ফতুল্লা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে রূপগঞ্জ থানার কাঞ্চন পৌরসভার কালাদী এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। তবে, তখন আঙুলের ছাপের মাধ্যমে জাতীয় তথ্য বাতায়নে পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পরে মরদেহটি অজ্ঞাত হিসেবেই ৩১ মার্চ রাজউকের কবরস্থানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে দাফন করা হয় এবং পরদিন উপপরিদর্শক ফরহাদ হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন বলে জানান রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন।
“মরদেহটি অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার করা হয়। তার মাথা, মুখমণ্ডল, হাত বা ও বুকে আঘাতের চিহ্ন ছিল। নীলাফুলা জখম ছিল।”
শরীরের এসব জখম হত্যার পূর্বের নির্যাতনের নির্দেশ করছে বলে জানান তিনি।
একইদিন ফতুল্লা মডেল থানায় শুভকে অপহরণের অভিযোগে মামলা রেকর্ড করা হয়। ওই মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাখাওয়াত ইসলাম রানাকে প্রধান আসামি করে আরও ১০ জনকে অভিযুক্ত করেন শুভর মা মাকসুদা বেগম।
সাখাওয়াত ইসলাম রানা ২০০৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়া যুবদলের সেই সময়ের ক্যাডার মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভাগ্নে।
শুভর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ঘটনাটিতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রানা জড়িত থাকায় পুলিশ শুরু থেকেই তদন্তে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি রানার নাম বাদ দিয়ে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছিল বলেও অভিযোগ।
শুভর মা মাকসুদা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, “পুলিশ পরশুদিনও বলেছে, আপনার ছেলেকে নিতে চাইলে রানার নাম দিয়েন না, আপনার ছেলেকে বের করে দিচ্ছি। রানার কাছে সে স্পেশাল ট্রিটমেন্টে আছে। পুলিশ শুরুতেই আসামিগোরে ধরলে আমার পোলাটারে অন্তত জীবিত পাইতাম। আমি রানাসহ সবার বিচার চাই।”
এদিকে, মামলায় মাকসুদা অভিযোগ করেন, তার বড়ছেলে শুভকে মারধরের পর একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে তোলা হয়। ওই ইজিবাইকের পেছনে পেছনে শুভর মোটরসাইকেলটিও চালিয়ে যান স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রানা। এরপর শুভ কিংবা তার মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার ১৫ থেকে ২০ দিন আগে চাষাঢ়া রেললাইন এলাকায় সাখাওয়াত ইসলাম রানার সঙ্গে তর্ক হয় শুভর। এরপর থেকে রানা ও তার সহযোগীরা শুভকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিলো বলেও এজাহারে উল্লেখ করেন তার মা।
এ প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি গ্যারেজের সামনে সাখাওয়াত ইসলাম রানাসহ কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। তর্কের এক পর্যায়ে ছুরি হাতে রানা ও তার সহযোগীদের ধাওয়া দেন শুভ।
তার মা এজাহারে আরও লেখেন, শুভ আগে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র মেরামতের কাজ করলেও পরে এলাকার কিছু বখাটে যুবকের সঙ্গে মাদক সেবনে আসক্ত হয়ে পড়ে। অপরাধ কর্মকাণ্ডেও সে জড়িয়ে পড়েছিল।
মামলার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও শুভর সন্ধান দিতে পারেনি।
এদিকে, অপহরণের এক সপ্তাহ পর মিললো তার লাশের সন্ধান।
মামলার বিষয়ে কথা বলতে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, এ অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তাকে এই মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।
“এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হলে আমি যে এতে জড়িত না, তা বেরিয়ে আসবে। প্রশাসনের প্রতি আহ্বান, তদন্ত যেন সুষ্ঠু হয়”, যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, “আমি যেকোনো হত্যার বিচার চাই। সাখাওয়াত ইসলাম রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ যা উঠেছে তা তদন্ত সাপেক্ষ ব্যাপার। তদন্তে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রশাসন আইনগতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু ইনটেনশালি যদি কেউ তাকে অযথা ফাঁসাতে চায় এমন প্রমাণিত হয়, সেক্ষেত্রে প্রশাসন যেন তাকে হয়রানি না করে।”
একইসঙ্গে যেহেতু সে বিএনপির একটি সহযোগী সংগঠনের নেতা, সেক্ষেত্রে দলের হাইকমাণ্ড বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিবে।